- প্রবন্ধ বিষয়ঃ গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন
- জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে নারায়ণগঞ্জে ১১ দলীয় ঐক্যের গণসমাবেশ ও গণমিছিল
- জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে তা হবে শহীদের রক্তের সাথে বেইমানী'—নারায়ণগঞ্জে জামায়াতের সেমিনারে নেতৃবৃন্দ
- জনগন জামায়াত কে ভোট দেওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে নিছে- আবদুল জব্বার
- মদনপুর,মদনগঞ্জ রাস্তাটি সংস্কারের দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত

প্রবন্ধ বিষয়ঃ গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন
প্রবন্ধ
বিষয়ঃ গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন
উপস্থাপনায় ঃ এডভোকেট আব্দুস সামাদ মোল্লা
সিনিয়র আইনজীবী, নারায়ণগঞ্জ জজ কোর্ট
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
সুধীমন্ডলী আপনারা সবাই অবগত আছেন যে, ২০২৪ সালের ছাত্র জনতার গনঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী, ˆ¯^রাচারী এবং ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং শেখ হাসিনার সরকারের পতন হয়| অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ের সার্বজনীন রাজনৈতিক দাবি ছিল-রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় এমন মৌলিক সংস্কার আনয়ন, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে কোন ব্যক্তি বা দল যেন পুনরায় একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে না পারে| অর্থাৎ এই আন্দোলনের কেন্দ্রীয় লক্ষ্য ছিল “ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এবং সাংবিধানিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা|”
এই গণআকাঙ্খাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন' গঠিত হয়, যেখানে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন| দীর্ঘ আলোচনার পর ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, যার মধ্যে ৪৭টি ছিল সরাসরি সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত| এই প্রস্তাবসমূহ ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহনে আনুষ্ঠানিকভাবে ¯^াক্ষরিত হয় যা “জুলাই জাতীয় সনদ” হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে|
এই সনদের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ১৩ নভে¤^র রাষ্ট্রপতি “জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫” জারি করেন এবং এই আদেশের মাধ্যমে সনদকে একটি কার্যকর আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা হয় এবং জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত গ্রহণের পথ উন্মুক্ত করা হয়|
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই একটি ঐতিহাসিক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়| নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এই গনভোটে প্রায় ৬৮.৫৯ শতাংশ ভোটার “হ্যা” ভোট প্রদান করে জুলাই সনদের পক্ষে সুষ্পষ্ট সমর্থন ব্যক্ত করে| জনগনের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেট স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা কেবল আইন প্রণেতা হিসেবে নয় বরং “সংবিধান পরিষদ“ এর সদস্য হিসেবে দ্বিতীয় শপথ গ্রহণ করে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে জুলাই সনদের আলোকে সংস্কার সম্পন্ন করবেন| যে শপথ ইতোমধ্যে বিরোধীদল নিয়েছে|
অতএব, এই গণভোটের ফলাফলকে একটি সাধারণ রাজনৈতিক মতামত হিসেবে দেখা যায় না| এটি একটি সুষ্পষ্ট সাংবিধানিক নির্দেশনা যা জনগনের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রত্যক্ষ বহিঃপ্রকাশ|
কিন্তু অতিব দুঃখের বিষয় নির্বাচনের পূর্বে বর্তমান সরকার যে অবস্থান গ্রহণ করেছিল, ক্ষমতায় আসার পর তার সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান গ্রহণ করেছে| এই “চেয়ার বদলের সঙ্গে কথা বদল” কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, এটি সরাসরি গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে|
পাতা-০২
এক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের মাননীয় আইনমন্ত্রী সরাসরি ¯^-বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেছেন|
বর্তমান সরকারের আইনমন্ত্রী অন্তবর্তী সরকারের সময় রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি এবং সেই আদেশের ওপর গণভোট আয়োজনের পক্ষে আইনি পরামর্শ প্রদান করেছেন| এমনকি তিনি মত দিয়েছিলেন যে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে যদি সংবিধান সংস্কার পরিষদ জুলাই সনদ বাস্তাবায়ন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে তা ¯^য়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে, অর্থ্যাৎ একটি 'চঁহরঃরাব সবপযধহরংস" যুক্ত কারার প্রস্তাবও তিনি দিয়েছিলেন|
কিন্তু ক্ষমতায় এসে একই ব্যক্তি এখন সেই আদেশকেই “সংবিধান বহির্ভূত ” বলে আখ্যায়িত করছেন| এটি একটি স্পষ্ট আইনি ও ˆনতিক ¯^বিরোধিতা| আইনমন্ত্রীর পথ অনুসরন করে ¯^রাষ্ট্রমন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী, প্রবাসী কল্যান ও ˆবদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং গণভোটের বিরুদ্ধে সক্রিয় অবস্থান গ্রহণ করেছেন| এই ধরনের অবস্থান কেবল রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ˆতরী করে না, বরং এটি জনগনের কাছে একটি বিভ্রান্তিকর ও অবিশ্বাসযোগ্য বার্তা প্রদান করে| মূলত ক্ষতাসীন সরকার জুলাই সনদ ও গণভোটকে একটি নীতিগত অঙ্গীকার হিসেবে নয়, বরং একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে| নির্বাচনের আগে জনসমর্থন অর্জনের জন্য তারা যে অবস্থান নিয়েছিল, ক্ষমতায় এসে সেই অবস্থান থেকে সরে এসে তারা এখন জবাবদিহিতা এড়িয়ে যেতে চাইছে| সাংবিধানিক ভাষায় এটিকে সুষ্পষ্ট জনবিশ্বাস ভঙ্গ (নৎবধপয ড়ভ ঢ়ঁনষরপ ঃৎঁংঃ)|
গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের উপায় সমূহঃ
১| তীব্র গণআন্দোলনঃ বর্তমান বিএনপি সরকার গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নে গড়িমসি এবং তীব্র অনিহা
প্রকাশ করছে| যদি সরকার গণভোটের গণরায় না মানে তাহলে জুলাই সনদের পক্ষের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, গণঅভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া দলসমূহকে অন্যান্য সমমনা ছোটখাট রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজকে সাথে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে|
২| সংসদে চাপ সৃষ্টিঃ যদিও বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ সখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে তথাপিও সংসদে গণভোটের
গণরায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে অন্যান্য ছোটখাট রাজনৈতিক দল এবং ¯^তন্ত্র
এমপিদের যৌথ উদ্যোগে সংস্কার প্রস্তাবগুলো পার্লামেন্টে পেশ করে আইন পাশের জন্য সরকারের|উপর
ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করতে হবে|
৩| নোট অব ডিসেন্ট হিসেবে চিহ্নিতকারীঃ জনগণ ও সুশীল সমাজ কর্তৃক বিএনপিকে “নোট অব ডিসেন্ট বা
গণরায় অমান্যকারী” হিসাবে চিহ্নিত করতে হবে|
৪| সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনঃ জুলাই সনদ অনুযায়ী তথা গণভোটের গণরায় অনুযায়ী সংস্কারগুলো
বাস্তবায়নের জন্য নতুন নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি "সংবিধান সংস্কার পরিষদ" গঠন করে
১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংশোধন সম্পন্ন করার জন্য আইনি চাপ প্রয়োগ করতে হবে|
৫| সংবাদ মাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকাঃ মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া এবং নাগরিক সমাজের মাধ্যমে
গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জনমত গঠন করা এবং সরকারের উপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করতে হবে|
মূলত, বিএনপি যদি সাংবিধানিক উপায়ে (সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে) জুলাই সনদ তথা গণভোটের
গণরায় বাস্তবায়ন না করে তাহলে রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমেই গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করতে
হবে|
পাতা-০৩
উপরোক্ত সাংবিধানিক, আইনি ও নীতিগত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নিম্নলিখিত দাবিসমূহ একটি যৌক্তিক ও অনিবার্য পরিণতি হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে:
ক) 'জুলাই সনদ'-এর অবিকৃত ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন (অং রঃ রং ওসঢ়ষবসবহঃধঃরড়হ):
গণভোটে জনগণের ম্যান্ডেট সনদের সামগ্রিকতার ওপর দেওয়া হয়েছে, কোনো পৃথক ধারার ওপর নয়| তাই সনদের কোনো অংশ কাটছাঁট, দলীয় ব্যাখ্যায় খণ্ডিত বা সংশোধন না করে অবিল¤ে^ তা হুবহু (ধং রঃ রং) বাস্তবায়ন করতে হবে|
খ) সংবিধান সংস্কার পরিষদ'-এর কার্যক্রম অবিল¤ে^ শুরু:
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অবিল¤ে^ “সংবিধান সংস্কার পরিষদ”-এর সদস্য হিসেবে দ্বিতীয় শপথ গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে| কোনো ধরনের কালক্ষেপণ ছাড়াই নির্ধারিত ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সমগ্র সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে|
গ) সংস্কার প্রক্রিয়ায় শতভাগ ¯^চ্ছতা ও জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিতকরণ:
সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়াটি যেন পুনরায় দলীয় বৃত্তে বা সিদ্ধান্তে বন্দি না হয়, সেজন্য এর প্রতিটি ধাপে শতভাগ ¯^চ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে| সংস্কারের খসড়া প্রস্তাব প্রকাশ, জনসম্মুখে উন্মুক্ত আলোচনা এবং নাগরিক সমাজের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে|
ঘ) সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্ণাঙ্গ ¯^াধীনতা নিশ্চিতকরণ:
জুলাই সনদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) এবং মহাহিসাব-নিরীক্ষক (সিএজি)-সহ সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে অবিল¤ে^ ও কার্যকরভাবে ¯^াধীন করতে হবে| এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সব ধরনের দলীয় প্রভাব বা হস্তক্ষেপ চিরতরে দূর করতে হবে|
ঙ) সময়সীমা লঙ্ঘনে ¯^য়ংক্রিয় বাস্তবায়ন ব্যবস্থা (চঁহরঃরাব গবপযধহরংস) কার্যকর:
যদি কোনো অজুহাতে বা রাজনৈতিক কূটচালে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা না হয়, তবে কালক্ষেপণ রোধে গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে তা ¯^য়ংক্রিয়ভাবে বাস্তবায়িত হওয়ার আইনি ব্যবস্থা (চঁহরঃরাব গবপযধহরংস) অবিল¤ে^ সক্রিয় করতে হবে|
তারিখ: ৮মে ২০২৬ জুমাবার
সময় ঃ বিকাল ৩:০০টা
স্থানঃ শিল্পকলা একাডেমী মিলনায়তন, নারায়ণগঞ্জ